৮৫। সূরা আল বুরুজ (দূর্গ)

সূরার সারসংক্ষেপঃ      ১ম আয়াতে দুর্গ বিশিষ্ট আকাশের শপথ করে বোঝানো হয়েছে যে, এটি খুব সুরক্ষিত  এবং তাতে সৈন্য (ফেরেশতা) বিদ্যমান। দূর্গে যেমন ওয়াচ টাওয়ার থাকে ও  নিরাপত্তা প্রহরীরা সর্বদা সতর্ক দৃষ্টি রাখে তেমনি আকাশেও ব্যবস্থা রয়েছে। আকাশের দূর্গ থেকেই আল্লাহর বিভিন্ন শক্তি (বায়ু, পানি, শব্দ, ভূমিকম্প) ও বাহিনী (যেমন আবাবিল পাখি, ফেরেশতা ইত্যাদি) Deployed হয় ও deployed হবার আদেশ হয়।      

আয়াত ২, ৩ এ  যে দিনের ওয়াদা করা হয়েছে বলতে বিচারের দিনকে বোঝানো হয়েছে। আরো শপথ করা  হয়েছে যে দেখে (সাক্ষী) এবং যা দেখা হয় তার। বিচারের দিন সব সাক্ষী ও  সাক্ষ্য পেশ করা হবে এবং সেদিন কোন অবিচার হবে না। দুনিয়ায় সব বাহিনী প্রয়োগ না করা হলেও আখিরাতে সব ধরনের বিচারের জন্য আল্লাহ fully capable কারন তারই কাছে ফিরে আসতে হবে এবং তারই অধীনে বিচার হবে অতঃপর আল্লাহ তাঁর বাহিনী দিয়ে অপরাধীদের শায়েস্তা করবেন।    
৪র্থ ও ৫ম আয়াত অনুযায়ী মূলত তারা (গর্তওয়ালারা) মুমিনদের মারার জন্যই আগুনের গর্ত করেছিলো কিন্তু আল্লাহ বলেছেন মারা পড়েছে গর্তওয়ালারা (ধ্বংসের অভিশাপ দিয়েছেন)। আখিরাতে তাদের জন্য আগুনের জ্বালানী বিশিষ্ট গর্ত (জাহান্নাম) অপেক্ষা করছে (এই ঘটনার সাক্ষী বিচারের দিন যা ২য় আয়াতে বলা হয়েছে)। এজন্য ২ কারনেই তাদের গর্তওয়ালা বলা হয়েছেঃ মুমিনদের জন্য গর্ত করা ও নিজেরা জাহান্নামের গর্তে পড়া।     
“অভিসম্পাত গর্তওয়ালাদের উপর। যে গর্তে দাউ দাউ করে জ্বলা আগুন ছিল। যখন তারা সেই গর্তের কিনারে বসেছিল। এবং ঈমানদারদের সাথে তারা যা কিছু করছিল তা দেখছিল”। (আল কুরআন, ৮৫ তম সূরা আল বুরুজ, আয়াত ৪-৭)      

আল্লাহ জ্বলে পুড়ে মরার বীভৎস দৃশ্য বর্ননা না করে ইঙ্গিত দিয়ে অল্প ভাষায় তখনকার অবস্থা বর্ননা করেছেন এবং আমাদের শিখিয়েছেন কিভাবে এমন হৃদয় বিদারক, বীভৎস দৃশ্য বর্ননা করতে হয়।       

আয়াত ৮, ৯ এ বলা হয়েছে যে, তারা (গর্তওয়ালারা) মুমিনদের সাথে শত্রুতা কোন অধিকার বঞ্চিত হয়ে বা অত্যাচারিত হয়ে করে নাই; বরং মুমিনরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছিলো এ কারনেই ছিলো তাদের সব শত্রুতা।    

এখানে আল্লাহ মুমিনদের একা ভাবতে নিষেধ করে বলেছেন যে, মহাপরাক্রমশালী, প্রশংসিত, আকাশ ও পৃথিবীর রাজত্বের অধিকারী এবং সর্বদ্রষ্টা আল্লাহ তাদের সাথে আছেন।      

১০ম আয়াতে আল্লাহ বলেছেন; যারা মু’মিন পুরুষ ও নারীদের ওপর জুলুম-নিপীড়ন চালায় ও তওবা করেনা, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আযাব এবং এক্ষেত্রে যেহেতু তারা দুনিয়াতে মু’মিন পুরুষ ও নারীদের আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছিলো তাই আখিরাতে তাদের শাস্তিও হবে অনুরুপ তবে অধিকতর তীব্র জ্বালা-পোড়ার শাস্তি।      


১১ তম এই সূরার মাঝের মধ্যমনি এই আয়াতটিই সবচেয়ে শান্তিদায়ক।     
অর্থাৎ ১০ ও ১১ আয়াতে ২ ধরনের মানুষের ২ ধরনের জীবনধারা ও পরিনতির কথা বর্নিত হয়েছে। অত্যাচারিত ঈমানদারগন দুনিয়ায় কষ্টকর জীবন যাপন করার পর অধিক কষ্ট সহকারে, অত্যাচারিত হয়ে মারা যায়, এরপর আখিরাতে শান্তি, সাফল্যের অফুরন্ত জীবন লাভ করে    
অত্যাচারী মানুষগন আনন্দের জীবন যাপন করতে থাকাকালীন ঈমানদারদের কষ্ট দেয় যার ফলে দুনিয়ায় কিছুটা শাস্তি পেয়ে মারা যায়, এরপর অফুরন্ত (অথবা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত) ব্যর্থতার জীবন লাভ করে।     
১২ তম আয়াত দ্বারা বোঝানো হচ্ছে যে, অপরাধ করার পর অল্পতেই পার পেয়ে যাওয়া যাবে এমন মনে করা ঠিক হবে না। নির্দোষ মানুষদের কষ্ট দেয়ার শাস্তি কত ভয়াবহ হতে পারে তা বোঝানোর জন্য আল্লাহ তার ‘রব’ নামটি ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ আল্লাহ তাদের পালনকর্তা, মালিক, পরিপূর্ন কর্তৃত্বশীল, বৃদ্ধি নিশ্চিতকারী, অস্তিত্ব রক্ষাকারী, পুরষ্কার প্রদানকারী হওয়ায় তাদের কষ্ট দেওয়ার প্রতিশোধ আল্লাহ কঠিনভাবে গ্রহন করবেন।     
 ১৩-১৬ আয়াতে বর্নিত হয়েছে যে, আল্লাহ দ্বিতীয় বার সৃষ্টি করার অন্যতম কারন হলো ন্যায়বিচার। তিনি ক্ষমাশীল, প্রেমময়; সাথে সাথে সম্মানিত আরশের মালিকও বটে। তাই তিনি অত্যাচারিত মুমিনদের আবার সৃষ্টি করে ক্ষমা করবেন; সাথে সাথে যারা অপরাধ করে তাওবা করে তাদেরও এবং আরশের মালিক হিসাবে অত্যাচারীদের (যারা তাওবা করেনি) বিচার করে যা চান তাই করবেন।      
আয়াত ১৭, ১৮ তে ইতিহাসের সবচাইতে শক্তিশালী, ইসলাম ও খোদাবিরোধী  সৈন্যদলের পরিনতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহ এটা বোঝাতে যান যে, আল্লাহর  শক্তি ও তার বাহিনীর বিপরীতে ঐসব সেনাদলের কি করুন পরিনতিই না হয়েছিলো!  সেই তুলনায় তোমরা (যারা ইসলামের বিরোধিতা করছো) তো অতি নগন্য, তাই তোমাদের  পরিনতির কথা ভেবে নাও এবং বিরত হও।     
আয়াত ২০ এ বোঝানো হয়েছেঃ অত্যাচারীরা মনে করে তারা ঈমানদারদের বিপরীতে শক্তিমান কিন্তু মূলত আল্লাহ তাদেরকে সবদিক থেকে সবসময়েই ঘেরাও করে রাখেন এবং আল্লাহর পরিপূর্ন নিয়ন্ত্রন ও ক্ষমতার বলয়ের মধ্যেই তারা থাকে। এটি খুব ভালোভাবে তারা বুঝতে পারবে বিচারের দিন; যেদিন তারা নিজেদেরকে সবদিক থেকে ঘেরাও অবস্থায় নিজ চোখে দেখতে পাবে। তখন তারা বুঝবে তারা কত অসহায়!
২১ নং আয়াতে বলা হয়েছে আল কুরআনের কথা। ১৫ তম আয়াতে আল্লাহর আরশকে যেমন মাজীদ (সম্মানিত) বলা হয়েছে তেমনি এই আয়াতেও আল কুরআনকে মাজীদ (সম্মানিত) বলা হয়েছে। আগের ২০ নং আয়াতের সাথে কন্টিনিউএশনে বলা যায়; এই মহান আল কুরআন আমাদের সবাইকে পরিবেষ্টিত করে রেখেছে। মুমিনদের সাহায্য করে যাচ্ছে ও অত্যাচারীদের উপরও ক্ষমা ও ফিরে আসার পরিবেশ সৃষ্টি করে রাখছে; তা না হলে তারা ধ্বংস হয়ে যেত।  
আয়াত ২২ অনুযায়ী এ কুরআনের লেখা অপরিবর্তনীয়। এর বিলুপ্তি হবে না, এর অবমাননা সম্ভব না। দুর্গ এর সাথে তুলনীয় এমন নিরাপত্তার সাথে সংরক্ষিত ফলকে এর লেখাগুলো খোদিত রয়েছে যেখানে এর মধ্যে কোন রদবদল করার ক্ষমতা কারোর নেই। আল কুরআনের অনুসারীদের (সামান্য দুনিয়াবী) ক্ষতি করা গেলেও তাদের রক্ষাকবচ ঐ কুরআনের ক্ষতি করার সাধ্য অত্যাচারীদের নেই।   
এই সূরায় আল্লাহ খুব শৈল্পিকভাবে অত্যাচারীদের প্রতি তার ক্রোধের কথা ফুটিয়ে তুলেছেন অসাধারন দক্ষতায়। আর সূরার শেষটা তো এক কথায় awesome!  আল্লাহর বান্দা মুমিনদের যারা কষ্ট দেয় তাদের জন্য তিনি বলেছেন যে এই মুমিন  বান্দাদের ডেডিকেশন এর উৎস যে আল কুরআন তা অতি সুরক্ষিত। মুমিনদের সামান্য দুনিয়াবী ক্ষতি করতে পারলেও তাদের সংবিধান এবং নৈতিক শক্তির উৎস এর চুল পরিমান ক্ষতি তারা করতে পারার ক্ষমতাই রাখে না।      

কুরআন আখিরাতে মুমিনদের রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করবে ও তাদের পক্ষ্যে সাক্ষ্য দিবে যেমন এই সূরা সাক্ষ্য দিয়েছে আগুনের গর্তে  নিক্ষিপ্ত মুমিনদের। সুতরাং ভয় ও আক্ষেপ নাই, নাই কোন চিন্তা।    

একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, এই সূরার বর্ননা যেমন শৈল্পিক তেমনি বিষয়বস্তুর গঠনও আকর্ষনীয় ও বিষ্ময়কর! এই সূরার গঠনটি প্রতিসম বা চক্রাকার। ১ম অংশের সাথে শেষ অংশ এভাবে বিষয়বস্তু চক্রাকারে আবর্তিত হয়েছে।  আয়াত ১ এর সাথে মিল রেখে আয়াত ২১,২২ এ সুরক্ষা ও নিরাপত্তার বিষয়টি এসেছে। আয়াত ২,৩ এর সাথে মিল রেখে আয়াত ১৯, ২০ এ বিচার এর বিষয়টি এসেছে।   

আয়াত ৪-৭ এর মূল বিষয়বস্তু হলো শাস্তি যার মিল পাওয়া যায় আয়াত ১৭ ও ১৮ এর সাথে। আবার আয়াত ৮, ৯ এ বর্নিত আল্লাহর গুনাবলী এর সাথে মিল রয়েছে আয়াত ১৩-১৬ এর। ১০ম আয়াতে কঠিন শাস্তির বিষয়টির সাথে ১২ আয়াতের বিষয় মিলে যায়। মাঝের মধ্যমনি আয়াত হলো ১১ নম্বর। কি অসাধারন গঠন!     

আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ আগের (৮৪ তম) সূরা আল ইনশিকক এ  আকাশের কথা এসেছে। তারই ধারাবাহিকতায় এই সূরাও আকাশের কথা দিয়ে শুরু হয়েছে।       

পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ এই সূরার শেষে (আয়াত ২২) লাওহে মাহফুয এর কথা বর্নিত আছে যা আকাশে অবস্থিত। পরের ৮৬ তম সূরা আত তরিক শুরু হয়েছে আকাশের কথা দিয়ে।     

 ৮৫ তম সূরা আল বুরুজের শেষের দিকে (আয়াত ২০) বলা হয়েছে যে, আল্লাহ সবসময়েই তাদের ঘেরাও করে রাখেন, যার আরো বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায় পরের সূরা আত তরিক এর ৪র্থ আয়াতে (এমন একটি সত্ত্বাও নেই যার উপর তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত নেই)   


উপরের নোটের কিছু অংশ উস্তাদ নোমান আলী খান এর বিভিন্ন লেকচার এবং ইন্টারনেট থেকে কিছু ভিডিও, ছবি থেকে অনুপ্রানীত হয়ে সম্পাদনা করে গ্রহণ করা হয়েছে। কুরআন সম্পর্কে 
উস্তাদের দারুন বই কিনতে পারেন এই লিঙ্ক থেকেঃ রিভাইভ ইয়োর হার্ট ডিভাইন স্পিচ

মন্তব্যসমূহ